আন্তর্জাতিক

ইরানে করোনাভাইরাসে প্রকৃত মৃত্যু ধামাচাপা দেয়ার তথ্য ফাঁস!

প্রকাশিত : ২০:২২, আগস্ট ০৩,২০২০
ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক : ইরানে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা দেশটির সরকার যা দাবি করেছে, তার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি বলে বিবিসির পার্সিয়ান সার্ভিসের এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

সরকারের নিজস্ব রেকর্ডে দেখা গেছে যে, গত ২০শে জুলাই পর্যন্ত কোভিড ১৯ এর উপসর্গ নিয়ে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে মৃতের সংখ্যা ১৪,৪০৫ জন।

আক্রান্তের সংখ্যাতেও রয়েছে গড়মিল। যতো সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হয়েছে বলে জানা গেছে সেটা সরকারি পরিসংখ্যানের প্রায় দ্বিগুণ।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে মোট সংক্রমিত হয়েছেন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮২৭ জন। কিন্তু গোপনীয় রেকর্ডে এই সংখ্যা আসলে ৪ লাখ ৫১ হাজার ২৪ জন।

চীনের বাইরে যে দেশগুলোয় করোনা ভাইরাস ব্যাপক ক্ষতি করেছে, তার মধ্যে ইরান অন্যতম। সাম্প্রতিক সপ্তাহে, দেশটিতে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যায় ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়।

বিবিসির কাছে আসা মেডিকেল রেকর্ড এবং তালিকা অনুযায়ী, কোভিড -১৯ এ ইরানে প্রথম মৃত্যু হয়েছিল ২২ জানুয়ারি। যেটা কিনা দেশটিতে করোনা ভাইরাসের প্রথম অফিসিয়াল কেস প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ হওয়ার প্রায় এক মাস আগের ঘটনা।

ইরানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে অনেক পর্যবেক্ষক সরকারী পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায় থেকে আসা তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা গিয়েছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন কর্তৃপক্ষ মুখ খুললেও পরিসংখ্যানবিদরা বিকল্প অনুমান দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা কম হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা শুরুতে কম দেখা গিয়েছিল।

তবে বিবিসির তদন্তে জানা গেছে যে, ইরানের কর্তৃপক্ষ সকল আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও দৈনিক প্রকাশিত সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কম দেখিয়েছে, যা এটাই ইঙ্গিত করে যে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গোয়েন্দা সংস্থার চাপে ছিল।

এর মধ্যে ইরান জুড়ে থাকা বিভিন্ন হাসপাতালের প্রতিদিনের প্রবেশের বিবরণ রয়েছে, নাম, বয়স, লিঙ্গ, লক্ষণ, এবং কী কারণে রোগীরা কতো সময় ধরে হাসপাতালে ছিলেন, সেই তথ্যও পাওয়া যায়।

সূত্রটি বলেছে যে তারা এই তথ্য বিবিসির কাছে দিয়েছে যেন “সত্যের ওপর আলোকপাত করা হয়” এবং মহামারীকে ঘিরে “রাজনৈতিক খেলার” ইতি টানা হয়।

রাজধানী তেহরানে সবচেয়ে বেশি অন্তত ৮,১২০ জন কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত হয়ে না হলে এর লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন। তবে শুরুতে দেশটিতে ভাইরাসের প্রাথমিক কেন্দ্রস্থল ছিল কওম শহর। সেখানে আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছিল। সেখানে মারা গিয়েছিলেন মোট ১৪১৯ জন।

ফাঁস হওয়া তথ্যগুলোয় শনাক্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা পাওয়া গেছে সেটার সাথে সরকারী প্রতিবেদনে থাকা অসামঞ্জস্যতার মিল পাওয়া গেছে।

ফাঁস হওয়া ওই তালিকা অনুযায়ী ইরানে কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ২২শে জানুয়ারি, ইরানে আনুষ্ঠানিক ভাবে করোনাভাইরাসের প্রথম আক্রান্তের খবর প্রকাশ হয় এর প্রায় এক মাস পরে, ১৯শে ফেব্রুয়ারিতে।

প্রথম মৃত্যু এবং সরকারি খবর প্রকাশের মধ্যে থাকা ২৮ দিনে অন্তত ৫২ জন মারা গিয়েছিলেন বলে সূত্র থেকে জানা যায়।

যে চিকিৎসকরা এ বিষয়টি জানতেন তারা বিবিসিকে বলেছেন যে, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার চাপে ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন যে, মন্ত্রণালয় আসল তথ্য প্রকাশে “অস্বীকার করে”।

তিনি বলেন, প্রাথমিক ভাবে তাদের কাছে টেস্টিং কিট ছিল না এবং যখন তারা কিট পেল তখন সেগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করল না। নিরাপত্তা বিভাগের অবস্থানটা এমন ছিল, ইরানে যে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব আছে স্বীকার করা যাবে না।

কওম শহরের দুই সহোদর ডাক্তার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বাধ্য করেছিলেন যেন আক্রান্ত হওয়ার খবর সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়।

এদিকে, ইরানে সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব দিবসের সময়ে এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন আদায়ে এগুলো ছিল প্রধান কিছু সুযোগ। ভাইরাসের কারণে তারা এই সুযোগ গুলোকে ঝুঁকিতে ফেলতে চাইছিল না।

ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অভিযোগ করেছিলেন যে, নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য কেউ কেউ করোনা ভাইরাসকে ব্যবহার করতে চাইছে। ওই নির্বাচনে খুব কম ভোট পড়ে।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারী আঘাত হানার আগে থেকেই ইরান একের পর এক অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত ছিল।

পিএনএস/এএ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button