অপরাধসারাদেশ

শতকোটি টাকা পর্যন্ত ‘লোন করিয়ে’ দেন এই যুবলীগ নেতা

প্রকাশের সময় :
August 14,2020, দুপুর 12:36 pm
আপডেট :
August 14,2020, দুপুর 12:36 pm

ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট : ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক লোন সার্ভিস’ নামে ফেসবুক পেজ খুলে দেশব্যাপী ডিজিটাল প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশের যুবলীগ নেতা রাব্বী শাকিল ওরফে ডিজে শাকিল (৩২)। এর পর লাখ থেকে শুরু করে শত কোটি টাকা পর্যন্ত লোন করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কমিশন বাবদ হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। এ ছাড়া সেনাবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নাম করেও বেকার যুবকদের কাছ থেকে বাগিয়ে নেন ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করে। এভাবে শূন্য থেকে ফুলেফেঁপে অনেকটা রাতারাতি তিনি কোটিপতি বনে যান। রিশান ইন্টারন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক লোন সার্ভিস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তিনি।

দুই প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে দেশব্যাপী প্রতারণার অভিযোগে অবশেষে ডিজে শাকিলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার রাতে বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি টিম তাড়াশে ডিজে শাকিলের অফিসে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

বগুড়া ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আসলাম আলী বলেন, অভিযানকালে ডিজে শাকিলের সুসজ্জিত অফিসকক্ষ থেকে জব্দ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১ হাজার ২০১ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকার ভুয়া চেক, ৫০টির বেশি টাকার অঙ্ক ছাড়া স্বাক্ষর করা চেক, সামরিক বাহিনীসহ সরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নিয়োগপত্র ও চুক্তিনামা, জাল স্ট্যাম্প ও ড্যামি পেপার। এ ছাড়া পাওয়া গেছে বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির ৬০টি সিম কার্ড, তাদের নিজস্ব পরিচালিত ২২টি অনলাইন নিউজপোর্টালের তথ্য এবং আইডি কার্ড, দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার ভুয়া নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১২টি ফেসবুক আইডি, ৩৫টি ফেসবুক পেজ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সিলসহ চিঠি তৈরির ফরম্যাটসহ ২ টেরাবাইটের হার্ডডিস্ক, প্রিন্টারসহ ৩টি সিপিইউ ও ৩টি মনিটর এবং পূর্বালী ব্যাংকের সচল ৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।

বগুড়া ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ইমরান মাহমুদ তুহিন বলেন, গ্রেপ্তারদের নামে বগুড়া সদর থানায় প্রতারণা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, তাড়াশ উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি রাব্বী শাকিল ওরফে ডিজে শাকিল, তার সহযোগী একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইটি বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন কবির ও ব্যবস্থাপক হারুনার রশিদ।

ডিবি পুলিশ জানায়, ইন্টারন্যাশনাল লোন সার্ভিসের নামে ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দেখে বগুড়ার আমারা এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী আমানত উল্লাহ তারেক ও অভি এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী আশিক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কমিশনের মাধ্যমে তাদের পাঁচ কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে কয়েক দফায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন ডিজে শাকিল। এর পর তাদের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ঋণ অনুমোদনের চিঠি এবং সাড়ে চার কোটি টাকার দুটি চেকের স্ক্যান কপি মেইলে দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও চেকের মূল কপি না দেওয়ায় তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ঋণ অনুমোদনের চিঠি এবং চেকগুলো ভুয়া। পরে তারা বিষয়টি বগুড়া জেলা পুলিশকে জানালে ডিবির পরিদর্শক ইমরান মাহমুদ তুহিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাড়াশে অভিযান চালায়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, সরকারি সিলমোহর ও প্যাড ব্যবহার করে তৈরি করা বেশ কিছু ভুয়া নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয় ডিজে শাকিলের অফিস থেকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর বাঘমারার বাবুলুর রহমানের নামে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তৈরি করা মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জারের ভুয়া নিয়োগপত্র, নাটোরের গুরুদাসপুরের আরিফুল ইসলামের নামে বাংলাদেশ রাজস্ব বোর্ডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদের ভুয়া নিয়োগ পত্র, বগুড়ার হাজরাদীঘি তেলধাপ গ্রামের নাজেম উদ্দিনের নামে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরীর ভুয়া নিয়োগপত্র, রংপুরের বদরগঞ্জের দক্ষিণ বাওচন্ডি গ্রামের চাঁদ বাবুর নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিস সহায়ক পদের ভুয়া নিয়োগপত্র। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল জানিয়েছেন, একেকটি ভুয়া নিয়োগে তিনি ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন।

অভিযুক্ত ডিজে শাকিল প্রতারণা প্রসঙ্গে বলেন, আমি প্রতারণা করে নেওয়া এসব টাকা বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে লাগিয়েছি। এ ছাড়া ফূর্তি করেও অনেক টাকা নষ্ট করেছি। এখন আমার ভুল বুঝতে পারছি।

কে এই ডিজে শাকিল অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভয়ঙ্কর প্রতারক এ ডিজে শাকিল। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় খাঁপাড়ায়। তার বাবা কাজী গোলাম মোস্তফা উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি।

উপজেলার বারুহাঁস ইউনিয়নের দরিদ্র কৃষক গোলাম মোস্তফার ছেলে ডিজে শাকিল স্থানীয় বারুহাঁস হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ঢাকায় পাড়ি জমান। এর পর ২০০৮ সালে তাড়াশে ফিরে এসে নিজেকে চলচ্চিত্রের নৃত্য পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন। এর পর নিজের নাম রাব্বী শাকিলের পরিবর্তে ডিজে শাকিল হিসেবে ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে প্রচার চালাতে থাকেন।

একপর্যায়ে তাড়াশ দুধ বিক্রির বাজার এলাকায় শাকিল ট্রাভেলস নামের একটি অফিস খুলে সেখানে ট্যুরিস্ট ও বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যবসা শুরু করেন। এভাবে ব্যবসা শুরুর মধ্য দিয়ে তার প্রতারণা শুরু হয়। অল্পদিনের মধ্যেই মানবপাচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তিনি রিশান গ্রুপ নাম দিয়ে তাড়াশ উপজেলা পরিষদ গেট এলাকায় ও আলেপ মোড়ের আরিফিন প্লাজায় দুটি বিলাসবহুল অফিস খুলে বসেন। এর পর থেকে তার নানামুখী প্রতারণার জাল বিস্তৃত হতে থাকে। এদিকে ডিজে শাকিল হয়ে যান কোটি কোটি টাকার মালিক।

সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে ২০০৯ সালের দিকে টাকার প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতির পদ দখল করেন ও ২০১৫ সালে টাকার বিনিময়ে বাবা গোলাম মোস্তফাকে তাড়াশ উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি বানান।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, তার বাবা একজন নি¤œবিত্ত কৃষক হলেও রাতারাতি কৃষক লীগের পদটি পেয়ে যান ছেলে শাকিলের প্রভাব ও টাকার বিনিময়ে।

জানা গেছে, শাকিল তাড়াশে রাজকীয় জীবনযাপন শুরু করেন। দামি দামি পোশক-পরিচ্ছদের পাশাপাশি বাড়ি ও পৌর এলাকায় কয়েকটি জায়গাও ক্রয় করেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাও খুলে বসেন। কিন্তু এর আড়ালে তার প্রতারণার ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে।

পিএনএস/জে এ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button