জাতীয়

এসআইকে থাপ্পড় মেরে ওসি প্রদীপ বলেন, টেকনাফে ভালো মানুষ আসে?

ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট :
17 August, 2020
প্রকাশের সময় : সকাল,11:44 am
আপডেট : সকাল,11:44 am

নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের দুই তরুণ কক্সবাজার গিয়ে বিপদে পড়ে ৯৯৯-এ ফোন করে উদ্ধার পেতে পুলিশের সহযোগিতা চান। ঘটনাচক্রে টেকনাফ থানার সদ্য বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের খপ্পরে পড়েন তারা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওসি প্রদীপের সাজানো মাদক মামলায় দুইজনকেই কারাবরণ করতে হয়। একজন মুক্তি পেলেও অন্যজন এখনও আছেন কক্সবাজার কারাগারে।

জানা গেছে, দুই চাচাতো ভাই রায়হান মিয়া ওরফে প্রীতম (২৮) ও মো. লিংকন (১৮)। প্রীতম মালয়েশিয়া থেকে করোনা সংক্রমণের আগে দেশে ফেরেন। আর লিংকন স্থানীয় পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সাতগাঁ ইউনিয়নে।

প্রীতমের বাবা হুমায়ুন কবির জানান, চলতি বছরের জুনে এলাকায় মারামারিতে জড়ান তারা। পরে এ নিয়ে সালিশ হয়। সেখানে ঠিক হয়, তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। শাস্তির ভয়ে লকডাউনের মধ্যে কৌশলে কক্সবাজার চলে যান তারা। তবে সেখানে হোটেল-মোটেল বন্ধ থাকায় বিপদে পড়েন দুই ভাই।

পরে এক অটোরিকশা চালক তাদের জানায়, টেকনাফে গেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারবে সে। অটোরিকশা চালকের কথায় আস্থা রেখে টেকনাফ চলে যান প্রীতম ও লিংকন। সেখানে ওই অটোরিকশা চালক ও তার সঙ্গীরা দুই তরুণকে আটক করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণকারীদের আস্তানা থেকেই এক নারীর মোবাইল ফোন থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন প্রীতম। ওই ফোনকলের আগেই কৌশলে অপহরণকারীদের আস্তানা থেকে পালিয়ে যান লিংকন। ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে পরে টেকনাফ থানার একজন এসআই প্রীতমকে অপহরণকারীদের ডেরা থেকে উদ্ধার করেন।

এরপর তাকে নেওয়া হয় টেকনাফ থানায়। ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন ওই এসআই। এরপর দুই তরুণের স্বজনের সামনেই এসআইকে থাপ্পড় মেরে প্রদীপ বলেন, ওরা ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত। ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়া হবে। কোন সাহসে ৯৯৯-এ ফোন করল সে। টেকনাফ খারাপ জায়গা। এখানে কোনো ভালো মানুষ আসে!

হুমায়ুন কবির বলেন, বাড়ি থেকে উধাও হওয়ার পর লকডাউনের মধ্যে তাদের খোঁজ না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। দুইদিন পর আড়াইহাজার থানায় জিডি করি। এরপর ফোন করে ছেলের মুক্তিপণ বাবদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি আড়াইহাজার থানার ওসিকে জানাই।

ওসি ওই নম্বর ট্র্যাক করে জানান, মোবাইলটি টেকনাফ থানা এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

লকডাউনের মধ্যে ওসির পরামর্শে স্থানীয় জুয়েল, রফিকুল হামিদ জেনারেলকে নিয়ে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা হন তারা। কেউ যাতে পথে না আটকায় এ জন্য একটি স্লিপও দিয়ে দেন ওসি। সেটা নিয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছার পর তারা জানতে পারেন, কৌশলে টেকনাফের অপহরণকারীদের আস্তানা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন লিংকন। এরপর তিনি কক্সবাজারে তার এক আত্মীয়র বাসায় ওঠেন। লিংকনের ছাড়া পাওয়ার বিষয়টি আড়াইহাজার থানা পুলিশকে অবগত করেন তারা। পুলিশের পরামর্শে লিংকনকে নিয়ে টেকনাফের দিকে তারা রওনা হন। যাতে অপহরণসহ সার্বিক ঘটনা টেকনাফ থানা পুলিশকে জানাতে পারেন লিংকন।

টেকনাফ থানায় যাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, ৯৯৯-এ প্রীতমের ফোনকলের মাধ্যমে টেকনাফ থানার এক এসআই তাকে মুক্ত করে থানায় নিয়ে আসছেন। কিছুক্ষণ পর লুঙ্গি পরা অবস্থায় প্রীতমকে থানায় নিয়ে আসেন ওই এসআই। এরপর ওসির কক্ষে ঘটনার বিস্তারিত জানান ওই এসআই।

এটা শোনার পর ওসি প্রদীপ বলেন, বাপসহ ওরা ইয়াবা কারবারি। লকডাউনের মধ্যে কেন ওরা টেকনাফ আসবে। সব কটারে ইয়াবাসহ চালান দে।

এটা শোনার পর ওই এসআই বলেন, স্যার ৯৯৯-এ ফোনকলের পর ওকে উদ্ধার করেছি। ইয়াবার সঙ্গে জড়িত নয়।

এরপরই এসআইকে থাপ্পড় মারেন ওসি প্রদীপ।

প্রীতমের চাচা জুয়েল জানান, মিথ্যা মামলায় এখনো কক্সবাজারের জেলে রয়েছেন প্রীতম। আর লিংকন মুক্তি পেয়েছেন। ওসি প্রদীপ যে আচরণ করেছেন, এটা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়।

কলেজছাত্র লিংকন বলেন, দুইদিন থানায় আটকে রাখা হয়েছিল। ওসি প্রদীপের পায়ে ধরেছি যাতে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো না হয়। এরপরও ১৫ দিনের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে আমার ভাইকে ছাড়েনি। যে চক্র আমাদের অপহরণ করেছিল তাদের মধ্যে জায়েদ উদ্দিন নামে একজনকে আটক করা হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে প্রদীপ বিশ্রী ব্যবহার করলেও জায়েদকে কিছু বলেননি।

প্রীতম ও অপহরণকারী চক্রের সদস্য জাহেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, টেকনাফ থানাধীন হোয়াইকংয়ের লম্বাঘোনা এলাকায় হাবিব উল্লাহর বাড়ির সামনে একটি চক্র ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রীতম ও জায়েদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের সহযোগী অপর একজন হাতে থাকা বাজারের ব্যাগসহ দৌড়ে পালিয়ে যায়।

আড়াইহাজারের সাতগাঁ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হামিদ জেনারেল বলেন, প্রীতম ও লিংকন দুদজন আমাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। ঘটনাটি জানার পর প্রীতমের বাবার সঙ্গে কক্সবাজারে যাই। ওসি আমাদের অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করছিলেন। এরপর প্রীতমের প্যান্টের পকেটে ৪০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে- এটা দেখিয়ে তাকে মাদক মামলায় চালান দেওয়া হয়। আর লিংকনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের সাজা দেওয়া হয়। পুরো ঘটনা আড়াইহাজার আসনের এমপিকে জানিয়ে ওসি প্রদীপকে ফোন করতে অনুরোধ করি। এমপির অনুরোধও পাত্তা দেননি প্রদীপ।

প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি মামলা করে। আর রামু থানায় একটি মামলা করে।

পরে ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এতে নয়জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. মোস্তফা ও এসআই টুটুল। এদের মধ্যে আসামি মোস্তফা ও টুটুল পলাতক।

এর মধ্যে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া পুলিশের চার সদস্য এবং এ ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় তিন সাক্ষীকে গত শুক্রবার থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে র‌্যাব। যাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তারা হলেন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী মো. নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াছ।

“সুত্র পিএনএস/জে এ”

“ইনভেস্টিগেশন নিউজ বিডি”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button