অপরাধসারাদেশ

ইটনায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ঘুমন্ত অন্তঃসত্ত্বা বোনকে হত্যা করে বড় ভাই

ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট :
20 August, 2020
প্রকাশের সময় : মধ্যরাত,04:13 am
আপডেট : মধ্যরাত,04:16 am

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনায় বাবার বাড়িতে স্বামীর পাশে ঘুমন্ত অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ আকলিমা আক্তারকে (২০) উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন সহোদর ভাই মোতাহার হোসেন (৩০)।

গ্রেফতারের পর ১৬১ ধারায় পুলিশের কাছে এবং ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ঘাতক ভাই মোতাহার।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মোতাহার জানায়, প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসাতে ছোটবোনকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সে নিজেই হত্যা করে।

এর আগে সে বোন ও ভগ্নিপতিকে পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ায়। এছাড়া বাইরে থেকে শাবল দিয়ে এমনভাবে সিঁধ কেটে রাখা হয় যাতে মনে হয় সিঁধ কেটে ঘাতক ঘরে ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

বুধবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল বারী ১৬৪ ধারায় খাসকামরায় ঘাতক মোতাহারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

ইটনা থানার ওসি মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আহসান হাবীব আদালতে মোতাহারের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘাতক মোতাহার ইটনা উপজেলার রায়টুটী ইউনিয়নের কানলা গ্রামের মৃত ইছহাক আলীর ছেলে। নিহত আকলিমা আক্তার তার আপন ছোটবোন।

ইটনা থানার ওসি মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান আরও জানান, নিহত আকলিমা আক্তারকে একই গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে মাসুক মিয়া বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। মাসুক মিয়া আকলিমা আক্তারকে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল।

কিন্তু আকলিমার পরিবার এ বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এতে মাসুক ক্ষিপ্ত হয়ে জোরপূর্বক আকলিমাকে বিয়ের হুমকি দিয়েছিল।

এ অবস্থায় বছরখানেক আগে পার্শ্ববর্তী তাড়াইল উপজেলার বরুহা বড়হাটি গ্রামে ফুফাতো ভাই জিন্নত আলীর সঙ্গে আকলিমাকে বিয়ে দেয় তার পরিবার।

এ ঘটনার জের ধরে গত বৈশাখ মাসে বোরো ধান কাটার সময় মাসুক মিয়া দলবল নিয়ে আকলিমার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় রডের আঘাতে আকলিমার ভগ্নিপতি বকুলের বাম পা ভেঙে যায়। কিন্তু হামলাকারীরা প্রভাবশালী পরিবারের হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করারও সাহস পায়নি আকলিমার পরিবার।

এ ঘটনার পর আকলিমার বড় ভাই মোতাহার রিকশা শ্রমিকের কাজ করতে ঢাকায় চলে যায়।

গত কোরবানির ঈদের আগে সে মাসুক মিয়াকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা নিয়ে বাড়ি ফিরে। এজন্য ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার সময় সে ঘুমের ওষুধও সঙ্গে নিয়ে আসে।

ঈদের পর মোতাহার ছোটবোন আকলিমার বাড়িতে গিয়ে বোনজামাই জিন্নত আলীকে তাদের বাড়িতে আসার জন্য দাওয়াত করে আসেন।

গত শুক্রবার বিকালে আকলিমা ও তার স্বামী জিন্নত আলী কানলা গ্রামে মোতাহারদের বাড়িতে আসেন।

পরদিন শনিবার ১৫ আগস্ট রাত ৯টার দিকে মোতাহার একটি জগে পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আকলিমা ও জিন্নত আলীকে সঙ্গে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেন।

এ সময় আকলিমা ও জিন্নত আলীকে ঘুমের ওষুধ মেশানো জগের পানি খাওয়ানো হয়। এ ওষুধ মেশানো পানি পান করে রাত ১০টার দিকে বসতঘরের মাঝখানের কক্ষে লোহার খাটের ওপর শুয়ে তারা গভীরভাবে ঘুমাতে থাকেন।

রাত ১১টার দিকে মোতাহার একটি শাবল নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আকলিমা ও জিন্নত যে খাটের উপর ঘুমিয়েছিল সে খাট বরাবর নিচে বাইরে দিয়ে সিঁধ কেটে আবার ঘরে চলে আসে।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোতাহার ঘরে থাকা চাকু দিয়ে আকলিমার বুকের বাম পাশে পরপর দুটি আঘাত করে। এ সময় আকলিমা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলে চাকুটি বিছানার উপর ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বাইরে চলে যায় মোতাহার।

এ ঘটনায় ঘরের ভেতর শুয়ে থাকা পরিবারের সবার ঘুম ভেঙে যায়। আকলিমাকে বাঁচানোর জন্য ঘর থেকে ধরাধরি করে বারান্দায় নিয়ে আসে।

এ সময় ঘাতক মোতাহারও ঘরের ভেতর ঢুকে বোনকে ধরাধরি করে বারান্দায় এনে আকলিমার মাথায় পানি ঢালে। কিন্তু ততক্ষণে আকলিমা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ঘাতক মোতাহার এর দায় প্রতিপক্ষ মাসুক মিয়ার ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গত রোববার ১৬ আগস্ট দুপুরে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠানোর আগে থেকেই পুলিশ নিহতের বড় ভাই মোতাহারকে নজরে রাখে।

সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফনের পর পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে নিহত আকলিমা আক্তারের মা আরজুদা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে ইটনা থানায় মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় মোতাহারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। পুলিশের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মোতাহার হত্যার দায় স্বীকার করে। এ সময় সে জানায়, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই সে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে।

বুধবার ১৯ আগস্ট দুপুরে মোতাহারকে কিশোরগঞ্জের আদালতে পাঠানোর পর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে সে আদালতেও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

“সুত্র পিএনএস/এএ”

“ইনভেস্টিগেশন নিউজ বিডি”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button